
আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন প্ল্যাটফর্ম বাইন্যান্স জানিয়েছে, বড় ধরনের সাইবার হামলায় চুরি হওয়া অর্থের প্রায় অর্ধেক তারা জব্দ করতে সক্ষম হয়েছে। এই হামলায় প্রায় ৬৩০ কোটি ডলারের ডিজিটাল সম্পদ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে, যা ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম ক্রিপ্টো চুরির ঘটনা বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, চুরি হওয়া ডিজিটাল সম্পদের মধ্যে ৩০০ কোটি ডলারের অর্থ নিরাপদে জব্দ করা হয়েছে। তবে বিপুল পরিমাণ অর্থ এখনো অজ্ঞাতপরিচয় হ্যাকারদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল, একজন প্রকৌশলীর ল্যাপটপ হ্যাক করে অননুমোদিতভাবে অর্থ তুলে নেওয়া হয়েছে। পরে তদন্তে জানা যায়, হামলার পরিধি ছিল আরও বিস্তৃত।
বেশ কয়েকটি বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান এই সাইবার হামলার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার একটি হ্যাকার গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পেয়েছে। ২০২৫ সালে বাইবিট লেনদেন প্ল্যাটফর্ম থেকে ১৫০ কোটি ডলারের সম্পদ চুরির ঘটনাকেও ছাড়িয়ে গেছে এবারের ঘটনা।
যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিক্রেট সার্ভিস জানিয়েছে, চুরি হওয়া অর্থ শনাক্ত, জব্দ, অনুসরণ এবং উদ্ধার করতে তারা 'দিনরাত কাজ করছে'।
আর্থিক অপরাধ তদন্তে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান কেন্দ্রীয় সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, সাইবার অপরাধীদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনা হবে। বাইন্যান্সও জানিয়েছে, এ ঘটনায় তারা যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআইয়ের সঙ্গে কাজ করছে।
বাইন্যান্সের যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক লেনদেন প্ল্যাটফর্ম এই হামলায় আক্রান্ত হয়নি বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে চুরি হওয়া অর্থের অনুসন্ধান ও উদ্ধারে যুক্তরাষ্ট্রের তদন্তের এখতিয়ার রয়েছে। এ ধরনের ঘটনায় সাধারণত বিভিন্ন দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী একসঙ্গে কাজ করে।
এই হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু সম্পদও জড়িত ছিল। এর মধ্যে রয়েছে টেথার ও সার্কেলের মতো স্থিতিশীল ক্রিপ্টো মুদ্রা, যেগুলোর মূল্য ডলারের সঙ্গে সমন্বিত রাখা হয়।
ব্যবহারকারীদের আশ্বস্ত করে বাইন্যান্স জানিয়েছে, 'আপনাদের অর্থ নিরাপদ রয়েছে। সব ধরনের ক্ষতির দায়ভার আমরা বহন করব।'
হামলার পর শুরুতে সব ধরনের অর্থ জমা ও উত্তোলন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি। তবে পরবর্তী হালনাগাদ তথ্যে জানানো হয়, অর্থ জমা দেওয়ার কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে।
বাইন্যান্সের সহপ্রধান নির্বাহী রিচার্ড টেং বলেন, 'এই হামলা একজনের পক্ষে চালানো সম্ভব নয়। আমাদের প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হয়েছিল, নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনায় একজন প্রকৌশলীর ল্যাপটপ আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারে। তবে পরবর্তী তদন্তে হামলার আরও কয়েকটি প্রবেশপথের সন্ধান পাওয়া গেছে।'
হ্যাকারদের কৌশল সম্পর্কে তিনি আরও বলেন, 'তারা এমন একটি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ব্যবহার করেছে, যার মাধ্যমে নিজেদের ব্যবহৃত সরঞ্জাম ও হামলার চিহ্ন ধ্বংস করে ফেলেছে। এতে হামলার উৎস শনাক্ত করা এবং তদন্ত পরিচালনা করা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।'
প্রথম দিকে বাইন্যান্স জানিয়েছিল, প্রতিষ্ঠানটির উন্নয়ন ও পরিচালনাসংশ্লিষ্ট একজন প্রকৌশলীর ল্যাপটপ আক্রান্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে হামলার সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। তবে পরবর্তী বিবৃতিতে আরও বিস্তৃত নিরাপত্তা লঙ্ঘনের বিষয়টি উঠে এসেছে।
পরবর্তী এক বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, চুরি হওয়া সম্পদের ক্ষতিপূরণ দিতে তারা নিজেদের তহবিল থেকে ৬৩৪ কোটি ডলারের বেশি অর্থ সংরক্ষণ করেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ক্রিপ্টো মুদ্রা কেনার কার্যক্রমও চালিয়ে যাচ্ছে।
বাইন্যান্সে এই হামলার প্রভাব পড়েছে শুক্রবারের ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজারেও। নিউইয়র্কে শুক্রবার বিকেলের লেনদেনে বিটকয়েনের দাম ৫ শতাংশ কমে ৭৬ হাজার ৮০০ ডলারে নেমে আসে।
ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন প্রতিষ্ঠান কয়েনবেসের শেয়ারের দাম কমেছে ১২ শতাংশ। প্রত্যাশার তুলনায় সামান্য কম আয় প্রকাশ করায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনসংশ্লিষ্ট আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান রবিনহুডের শেয়ারের দামও কমেছে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ।
২০১৭ সালে চীনে প্রতিষ্ঠিত বাইন্যান্স ব্যবহারকারীদের ডিজিটাল সম্পদ কেনাবেচার সুযোগ দেয়। বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধিত ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৩০ কোটির বেশি বলে ধারণা করা হয়।
২০২৪ সালে বাইন্যান্স জানিয়েছিল, তাদের হেফাজতে থাকা সম্পদের পরিমাণ ১৬ হাজার কোটি ডলারের বেশি।
বাইন্যান্সের ব্যবহারকারী এবং সামগ্রিক ক্রিপ্টোকারেন্সি খাতের মধ্যে এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, এত বিপুল আর্থিক ক্ষতি সামাল দেওয়ার সক্ষমতা প্রতিষ্ঠানটির আদৌ আছে কি না।
প্রতিষ্ঠানটি বারবার আশ্বস্ত করেছে, গ্রাহকদের অর্থের সম্পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে এবং এই সংকট কাটিয়ে ওঠার মতো আর্থিক সক্ষমতা তাদের রয়েছে।
তবে ক্রিপ্টোকারেন্সির ইতিহাস পর্যবেক্ষণকারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ২০২২ সালে ধসে পড়া এফটিএক্সের উদাহরণ টানছেন। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী স্যাম ব্যাংকম্যান-ফ্রাইডও ধসের আগে একই ধরনের আশ্বাস দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি দেউলিয়া হয়ে গেলে গ্রাহক ও পুরো খাতকে বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়।
বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ সতর্ক করেছেন, বাইন্যান্সের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিকে আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নিশ্চয়তা হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। অর্থ ফেরত পেতে গ্রাহকদের আইনি পদক্ষেপও নিতে হতে পারে।
লন্ডনভিত্তিক আইন প্রতিষ্ঠান এডউইন কো-এর আইনজীবী ড্যানিয়েল টাঙ্কেল বলেন, বিষয়টি নির্ভর করবে 'গ্রাহকদের সঙ্গে চুক্তিতে কী ধরনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করলে বিন্যান্সের বিরুদ্ধে কোথায় ও কীভাবে মামলা করা সম্ভব, তার ওপর'।
উল্লেখ্য, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাইন্যান্সের কার্যক্রম নিয়ে আগে থেকেই নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর নজরদারি রয়েছে।
এদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর সাইবার অপরাধ তদন্ত প্রতিষ্ঠান টিআরএম ল্যাবস জানিয়েছে, এবারের হামলার বেশ কিছু কৌশলের সঙ্গে উত্তর কোরিয়াসংশ্লিষ্ট আগের সাইবার হামলার মিল রয়েছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালের বাইবিটে হামলার ঘটনাও রয়েছে।
গত পাঁচ বছরে হ্যাকারদের হামলায় ক্রিপ্টোকারেন্সি খাত বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। প্রায় প্রতিটি বড় ঘটনায় তদন্তকারীরা উত্তর কোরিয়ার হ্যাকারদের দায়ী করেছেন। এসব হামলার সঙ্গে দেশটির কুখ্যাত লাজারাস গ্রুপের নামও উঠে এসেছে। ট্রেডারট্রেইটর নামেও পরিচিত এই গোষ্ঠীর সদস্যদের উত্তর কোরিয়ার সরকারের হয়ে কাজ করার অভিযোগ রয়েছে।
ক্রিপ্টোকারেন্সি বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান চেইনঅ্যানালাইসিস জানিয়েছে, এই হামলার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার কোনো ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে তাদের 'উচ্চমাত্রার আস্থা' রয়েছে।
উত্তর কোরিয়া দরিদ্র একটি দেশ। দেশটিতে শিল্পকারখানা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিসর সীমিত। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির অর্থনীতি চাপে রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থ সংগ্রহের বিকল্প উপায় হিসেবে দেশটির সরকার সাইবার অপরাধকে কাজে লাগায়।
উত্তর কোরিয়া বরাবরই এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। তবে ক্রিপ্টোকারেন্সির লেনদেন বিশ্লেষণ এবং দেশত্যাগী ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার থেকে পাওয়া বিপুল তথ্য-প্রমাণ দেশটির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগকে জোরালো করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রীয় তহবিল সংগ্রহের হাতিয়ার হিসেবে হ্যাকিংকে ব্যবহার করে—এমন দেশ হিসেবে উত্তর কোরিয়াই এখন সবচেয়ে বেশি সন্দেহের মুখে রয়েছে।
<p style="text-align: center;">প্রকাশক, সম্পাদক: মোঃ রবিন মিয়া</p><p style="text-align: center;">নাম্বারঃ ০১৭৭২৬৬৬০৮৬</p><p style="text-align: center;">ঠিকানাঃ ৮১০/৩ শেওড়াপাড়া, মিরপুর, ঢাকা</p><p style="text-align: center;">মেইলঃ Protidinerbangladesh026@Gmail.com</p><p style="text-align: center;"><br></p>
Copyright © 2025 All rights reserved