ডেস্ক নিউজঃ মানবপাচার ও অনিয়মিত অভিবাসনে তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার ক্রমে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। পাচারকারীরা ফেসবুক, ইমো, হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামের মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে গ্রুপ খুলে ইউরোপের নৌকার ছবি ও যোগাযোগ নম্বর দিয়ে প্রচারণা চালিয়ে যুবকদের প্রলুব্ধ করছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে কম্পিউটার অপারেটর বা কল সেন্টারের লোভনীয় চাকরির ভুয়া বিজ্ঞাপন দিয়ে যুবকদের ফাঁদে ফেলা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই আজ বৃহস্পতিবার বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানবপাচারবিরোধী দিবস। দিবসটির এবারের মূল প্রতিপাদ্য ‘প্রতারণার ফাঁদে বন্দি’। বাংলাদেশেও দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউএনওডিসি ও রামরু পৃথক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। এসব অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে অংশ নেবেন প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের রাষ্ট্রদূতসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যক্তিরা।
মাদারীপুরের শিবচরের বাসিন্দা মাহতাব মৃধা ইউরোপ যাওয়ার স্বপ্নে ২০২২ সালে দালালের মাধ্যমে অবৈধ পথে লিবিয়ায় যান। ইতালি যাওয়ার উদ্দেশে সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখে পড়েন তিনি।
মাহতাব বলেন, ‘রাতে টেনশনে ঘুমাতে পারতাম না। মাথাভর্তি চিন্তা ছিল। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না। এর মধ্যে ১৪ লাখ টাকা ঋণ, মানুষের সুদের টাকা, আমি তখন বুঝতে পারছিলাম না কী করব।’
ইতালি যেতে তাঁর বাবা দালালের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। গরু বিক্রি, ঋণ ও কিস্তির টাকা মিলিয়ে ১৪ লাখ টাকা দিয়ে মাহতাব বিদেশের উদ্দেশে রওনা হন। দালালচক্র তাঁকে বিভিন্ন দেশ ঘুরিয়ে লিবিয়ায় নিয়ে যায়। সেখান থেকে মাছ ধরার একটি বোটে ইতালির উদ্দেশে রওনা করানো হয়। পাঁচ দিন সাগরে থাকতে হয়েছে। ওই সময় খাবার কিংবা পানি পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। সাগরের প্রচণ্ড ঢেউ দেখে মনে হয়েছিল বাঁচার আর আশা নেই। পরে বোটটি ইতালির পরিবর্তে মাল্টায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ইমিগ্রেশন পুলিশ তাঁদের আটক করে জেলে পাঠায়। ১৮ মাস কারাভোগের পর ২০২৩ সালের ২৩ অক্টোবর দেশে ফিরে আসেন মাহতাব। এরপর শুরু হয় নতুন আরেক সংকট। পাওনাদাররা টাকা ফেরত দিতে অনবরত চাপ দিতে থাকেন। এ সময় ব্র্যাকের মাধ্যমে তিনি কাউন্সেলিং সেবা পান। মাহতাব বলেন, ‘তিনবার কাউন্সেলিং নেওয়ার পর আমার মনে হয়েছে, আমি আগের চেয়ে শক্ত হয়েছি। আমার দ্বারা কিছু করা সম্ভব।’
অন্যদিকে কম্বোডিয়া থেকে ফেরত আসা এক বাংলাদেশি জানান, কম্বোডিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিএমইটির ছাড়পত্রসহ পাঁচ লাখ ৩০ হাজার টাকার বিনিময়ে আমাকে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর আমার পাসপোর্ট ও কাগজপত্র কেড়ে নিয়ে একটি সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ডে বিক্রি করে দেওয়া হয়। সেখানে আমার নাম নয়, পরিচয় ছিল একটি ‘কোড’। দেশ ছাড়ার আগে পাচারকারীরা একটি কোডওয়ার্ড মুখস্থ করিয়েছিল, যা ইমিগ্রেশনে বলতে বলা হয়। যা ছিল পাচারকারীচক্রের সদস্যদের গোপন সংকেত।
কম্বোডিয়ার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর অভিযানে চলতি বছরের জুন মাসেই দেশটি থেকে ৫৮৩ জন ভুক্তভোগী বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন। ফিরে আসা ব্যক্তিদের ৯৮ শতাংশ কোনো চাকরি পাননি, ৯০ শতাংশকে জোর করে স্ক্যামের কাজে যুক্ত করা হয়েছিল এবং ৮৬ শতাংশের পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।
এদিকে সম্প্রতি অনিয়মিত রুট ব্যবহার করে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টাও বেড়েছে। বাংলাদেশ থেকে সেনজেনভুক্ত দেশগুলোর কাছাকাছি দেশ সার্ভিয়া, সাইপ্রাস, বেলারুশসহ বিভিন্ন দেশে বৈধ পথেই যান বাংলাদেশিরা। সেখান থেকে অবৈধভাবে ইউরোপের দেশ ইতালি, মাল্টাসহ অন্য দেশে পাড়ি জমান তাঁরা। এই অবৈধ উপায়ে বিদেশ পাড়ির ক্ষেত্রে প্রলুব্ধ করতে ফেসবুকের বিভিন্ন পেজ, গ্রুপ, ইউটিউব ও টিকটকে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়।
সাগরপথে ইতালি ও গ্রিসে যাওয়ার শীর্ষে বাংলাদেশ
ইউরোপের সীমান্তরক্ষী বাহিনী ফ্রন্টেক্স এবং বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, সেন্ট্রাল মেডিটেরেনিয়ান রুট বা ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে ইতালিতে প্রবেশের চেষ্টাকারী দেশের তালিকায় গত কয়েক বছরের মতো এবারও বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বের মধ্যে প্রথম। শুধু ইতালিই নয়, ২০২৬ সালে লিবিয়া থেকে সাগরপথে গ্রিসে প্রবেশের দিক দিয়েও বাংলাদেশিরা নতুন রেকর্ড গড়ে শীর্ষে অবস্থান করছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ২০ হাজার ২৫৯ জন বাংলাদেশি ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশ করেছেন। আর ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই চার হাজার ২৪৯ জন ইতালিতে এবং তিন হাজার ৬০৮ জন গ্রিসে প্রবেশ করেছেন।
এসব অনিয়মিত পথে প্রাণও হারান অনেকে। ২০২৬ সালের ২১ মার্চ লিবিয়ার তোবরুক থেকে একটি নৌকা গ্রিসের উদ্দেশে রওনা হয়। নৌকাটি দিক হারিয়ে ছয় দিন খাদ্য ও পানিশূন্য অবস্থায় সাগরে ভেসে থাকে। পরে পাচারকারীদের নির্দেশে মৃতদেহগুলো সাগরে ফেলে দেওয়া হয়। এই ঘটনায় সুনামগঞ্জের ১২ জনসহ অন্তত ১৮ জন বাংলাদেশি সাগরে মারা যান। বেঁচে যাওয়া অনেককে লিবিয়ার ক্যাম্পে বন্দি রেখে জিম্মি করে পরিবারের কাছ থেকে ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত মুক্তিপণ আদায় করা হয়।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, ‘সাইবার স্ক্যাম এখন মানবপাচারের ভয়াবহ এক রূপ। কম্পিউটার অপারেটর, কল সেন্টার এক্সিকিউটিভসহ বিভিন্ন আকর্ষণীয় পদের চাকরির বিজ্ঞাপন দিয়ে ভুয়া ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সাহায্যে প্রলোভন দেখানো হয়। পরে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে অনলাইন প্রতারণার কাজে বাধ্য করা হয়। তাই থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, মিয়ানমার, লাওস ও ভিয়েতনামে চাকরির উদ্দেশে যাওয়ার আগে চাকরির সত্যতা ও ভিসার ধরন যাচাই করা জরুরি।’
তিনি আরো বলেন, ‘মানবপাচার বা অভিবাসী চোরাচালানের মতো অপরাধ দমন করতে হলে শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না, আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। মানবপাচারপ্রবণ জেলাগুলোতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের দৃঢ় অঙ্গীকার ছাড়া মানবপাচার, অর্থপাচার ও মাদকের মতো আন্তঃসম্পর্কিত অপরাধ নির্মূল করা কঠিন।’
ইউরোপে বাংলাদেশিদের অনিয়মিত অভিবাসন প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘অভিবাসন নিয়ে ইউরোপের দেশগুলো কঠোর ও বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও বাংলাদেশেরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত মানবাধিকার যাতে লঙ্ঘিত না হয়, সে বিষয়ে নজর দিতে হবে। ইউরোপ দীর্ঘদিন ধরে মানবাধিকারের কথা বলে আসছে, কিন্তু নিজেদের স্বার্থের ক্ষেত্রে অনেক সময় সেই নীতির ব্যত্যয় দেখা যাচ্ছে। ইউরোপের প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে কার্যকরভাবে মানবাধিকার রক্ষায় ভূমিকা রাখে, সে বিষয়ে বাংলাদেশকে আলোচনা করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘অনিয়মিত অভিবাসনের মূল কারণ অর্থনৈতিক। তাই বাংলাদেশের বড় কাজ হলো—দেশের কর্মসংস্থানের কাঠামো শক্তিশালী করা। বিশ্বের অনেক দেশ অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে অভিবাসনের চাপ কমিয়েছে। একসময় যেসব দেশ থেকে মানুষ বেশি বিদেশে যেত। অর্থনৈতিক কাঠামো শক্তিশালী হওয়ার পর সেসব দেশে সেই প্রবণতা কমে গেছে। বাংলাদেশেও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে। কারণ, বিদেশে যাওয়ার এই প্রবণতা নতুন নয়, বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে এবং দিন দিন বাড়ছে।’
<p style="text-align: center;">প্রকাশক, সম্পাদক: মোঃ রবিন মিয়া</p><p style="text-align: center;">নাম্বারঃ ০১৭৭২৬৬৬০৮৬</p><p style="text-align: center;">ঠিকানাঃ ৮১০/৩ শেওড়াপাড়া, মিরপুর, ঢাকা</p><p style="text-align: center;">মেইলঃ Protidinerbangladesh026@Gmail.com</p><p style="text-align: center;"><br></p>
Copyright © 2025 All rights reserved