আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ ভারতের শেয়ারবাজারে দরপতন এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ধারাবাহিক অর্থ প্রত্যাহারের মধ্যেও মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ বাড়িয়েছেন দেশটির অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগকারীরা।
গত সেপ্টেম্বরে ভারতীয় ইকুইটি মিউচুয়াল ফান্ডে নিট বিনিয়োগ পাঁচ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। একই সময়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি মূলধনি কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ এবং নিয়মিত কিস্তিভিত্তিক বিনিয়োগেও (এসআইপি) নতুন রেকর্ড হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশীয় বিনিয়োগকারীদের ধারাবাহিক অংশগ্রহণ ভারতীয় শেয়ারবাজারকে বৈশ্বিক অস্থিরতার ধাক্কা সামলাতে সহায়তা করছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাজার থেকে অর্থ তুলে নিলেও স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ দেশটির পুঁজিবাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য তৈরি করছে।
ভারতের মিউচুয়াল ফান্ড শিল্পের নিয়ন্ত্রক সংস্থা অ্যাসোসিয়েশন অব মিউচুয়াল ফান্ডস ইন ইন্ডিয়ার (অ্যামফি) তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসব চিত্র উঠে এসেছে।
ইকুইটি ফান্ডে বিনিয়োগ ৪০০ কোটি ডলার
সেপ্টেম্বর মাসে ভারতের ইকুইটি মিউচুয়াল ফান্ডগুলোতে নিট বিনিয়োগ এসেছে ৩৮ হাজার ৩০৭ কোটি রুপি, যা প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের সমান। আগের পাঁচ মাসের মধ্যে কোনও এক মাসে এত বেশি বিনিয়োগ আসেনি।
এ নিয়ে টানা ৬৭ মাস ভারতীয় ইকুইটি মিউচুয়াল ফান্ডগুলোতে নিট বিনিয়োগ ইতিবাচক রয়েছে। অর্থাৎ, পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে এসব ফান্ডে বিনিয়োগ প্রত্যাহারের তুলনায় নতুন বিনিয়োগের প্রবাহ বেশি থাকছে।
বাজারে দরপতনের মধ্যেও বিনিয়োগকারীদের এই ধারাবাহিক অংশগ্রহণ ভারতের পুঁজিবাজারে দেশীয় অর্থের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব তুলে ধরছে।
সেপ্টেম্বরে বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীরা ভারতীয় বাজার থেকে ৩৭৫ কোটি ডলার প্রত্যাহার করেন। বিপরীতে, দেশীয় মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের প্রবাহ বাজারে অর্থের জোগান বজায় রাখতে সহায়তা করেছে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি কোম্পানির ফান্ডে রেকর্ড বিনিয়োগ
সেপ্টেম্বরে ক্ষুদ্র মূলধনি বা স্মল-ক্যাপ ফান্ডে নিট বিনিয়োগ এসেছে ৯ হাজার ৩৯ কোটি রুপি। মাঝারি মূলধনি বা মিড-ক্যাপ ফান্ডে এসেছে ৭ হাজার ৮৪৫ কোটি রুপি। উভয় শ্রেণির ফান্ডেই এটি রেকর্ড পরিমাণ বিনিয়োগ।
সাধারণত ক্ষুদ্র ও মাঝারি মূলধনি কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি থাকে। তবে দীর্ঘমেয়াদে বেশি মুনাফার সম্ভাবনায় এসব ফান্ডের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নিয়মিত কিস্তিতে মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের পদ্ধতি এসআইপিতেও নতুন রেকর্ড হয়েছে। সেপ্টেম্বরে এ পদ্ধতিতে বিনিয়োগের পরিমাণ আগের মাসের তুলনায় শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ৩২ হাজার ৪৯০ কোটি রুপিতে দাঁড়িয়েছে। ডলারের হিসাবে এর পরিমাণ প্রায় ৩৩৯ কোটি।
এসআইপির মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা নির্দিষ্ট বিরতিতে নির্ধারিত অঙ্কের অর্থ মিউচুয়াল ফান্ডে জমা দেন। এতে এককালীন বড় অঙ্কের বিনিয়োগের পরিবর্তে নিয়মিত সঞ্চয়ের মাধ্যমে বাজারে অংশ নেওয়া যায়।
অ্যামফির প্রধান নির্বাহী ভেঙ্কট চালাসানি বলেছেন, মূল্যস্ফীতির চাপ, অপরিশোধিত তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং যুক্তরাষ্ট্রের বন্ডের উচ্চ সুদহার সত্ত্বেও দেশীয় বিনিয়োগকারীরা ধারাবাহিকভাবে অর্থ বিনিয়োগ করছেন। বিশেষ করে এসআইপির মাধ্যমে বিনিয়োগে স্থিতিশীল প্রবাহ খুচরা বিনিয়োগকারী ও দেশীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের আস্থার প্রতিফলন।
নিফটি ৫০ সূচকে বড় পতন
দেশীয় বিনিয়োগের প্রবাহ ইতিবাচক থাকলেও ভারতের শেয়ারবাজারে চাপ রয়েছে। সেপ্টেম্বরে দেশটির প্রধান শেয়ারসূচক নিফটি ৫০ কমেছে ৬ দশমিক ১ শতাংশ। ২০২৬ সালের শুরু থেকে সূচকটির পতনের পরিমাণ প্রায় ১৪ দশমিক ৪ শতাংশ।
তবে বাজারের সব অংশে একই ধরনের দরপতন দেখা যায়নি। চলতি বছরে স্মল-ক্যাপ সূচক ৯ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে, মিড-ক্যাপ সূচক কমেছে ২ দশমিক ৭ শতাংশ, যা নিফটি ৫০-এর পতনের তুলনায় অনেক কম।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দেশীয় বিনিয়োগকারীদের ধারাবাহিক অর্থপ্রবাহ বাজারের পতন পুরোপুরি ঠেকাতে না পারলেও দরপতনের চাপ সামলাতে সহায়তা করছে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এসআইপির মাধ্যমে বিনিয়োগের ধারাবাহিক বৃদ্ধি ভারতের বিনিয়োগব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা আবার বাজারে ফিরলে দেশীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের সমর্থন বড় ধরনের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বা ‘বুল রান’ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
স্বর্ণ ও রুপার ফান্ডেও বাড়ছে আগ্রহ
শেয়ারবাজারে অনিশ্চয়তার মধ্যে বিনিয়োগকারীরা মূল্যবান ধাতুভিত্তিক ফান্ডের প্রতিও আগ্রহ বাড়িয়েছেন।
সেপ্টেম্বরে গোল্ড এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ডে (ইটিএফ) বিনিয়োগ আগের তুলনায় ৭১ শতাংশ বেড়ে ৪ হাজার ৪৫১ কোটি রুপিতে পৌঁছেছে। একই সময়ে সিলভার ইটিএফে বিনিয়োগ এসেছে ১ হাজার ৯৭৪ কোটি রুপি।
সাধারণত বাজারে অস্থিরতা বাড়লে কিছু বিনিয়োগকারী ঝুঁকি সামলাতে স্বর্ণ ও রুপার মতো সম্পদে বিনিয়োগ বাড়ান। মূল্যবান ধাতুভিত্তিক ফান্ডে অর্থপ্রবাহের এই বৃদ্ধি বিনিয়োগকারীদের বিকল্প সম্পদের প্রতি আগ্রহেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সব মিলিয়ে, বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাহার এবং শেয়ারসূচকের পতনের মধ্যেও ভারতের মিউচুয়াল ফান্ডে দেশীয় বিনিয়োগের প্রবাহ শক্তিশালী রয়েছে। বিশেষ করে নিয়মিত কিস্তিভিত্তিক বিনিয়োগের বিস্তার দেশটির পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের ভূমিকা বাড়াচ্ছে। তবে এই প্রবণতা ভবিষ্যতে শেয়ারবাজারের স্থিতিশীলতা কতটা নিশ্চিত করতে পারবে, তা নির্ভর করবে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, বৈশ্বিক সুদের হার, জ্বালানির দাম এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আচরণের ওপর। সূত্র: রয়টার্স
<p style="text-align: center;">প্রকাশক, সম্পাদক: মোঃ রবিন মিয়া</p><p style="text-align: center;">নাম্বারঃ ০১৭৭২৬৬৬০৮৬</p><p style="text-align: center;">ঠিকানাঃ ৮১০/৩ শেওড়াপাড়া, মিরপুর, ঢাকা</p><p style="text-align: center;">মেইলঃ Protidinerbangladesh026@Gmail.com</p><p style="text-align: center;"><br></p>
Copyright © 2025 All rights reserved