বাংলাদেশসহ ২৯ দেশের পাইলট-ক্রুদের ওপর ইসরায়েলের নিষেধাজ্ঞা মানবে এয়ার ফ্রান্স

ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই—এমন দেশের নাগরিকদের পাইলট ও কেবিন ক্রু হিসেবে নিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করেছে দেশটি। দ্বৈত নাগরিকত্বধারীরাও এই বিধিনিষেধের আওতায় রয়েছেন। ইসরায়েলি আকাশসীমায় ফ্লাইট পরিচালনার ক্ষেত্রে এসব নিয়ম মেনে চলার কথা জানিয়েছে ফরাসি বিমান সংস্থা এয়ার ফ্রান্স।

ইসরায়েলি গণমাধ্যম ও ফরাসি অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম মিডিয়াপার্টের বরাত দিয়ে আল জাজিরা জানিয়েছে, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ইরান, ওমান, সৌদি আরব, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও আলজেরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের ওপর এই বিধিনিষেধ প্রযোজ্য। বিভিন্ন প্রতিবেদনে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা দেশের সংখ্যা ৩১টি বলা হলেও যুক্তরাষ্ট্রের বিমান সংস্থা ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের একটি অভ্যন্তরীণ স্মারকপত্রে ২৯টি দেশের তালিকা রয়েছে।

জাতীয়তার ভিত্তিতে বিমানকর্মীদের দায়িত্ব পালনে এমন বিধিনিষেধ আরোপের ঘটনায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলে ফ্লাইট পরিচালনাকারী আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলো কীভাবে এই নিয়ম কার্যকর করবে, তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

আল জাজিরাকে এয়ার ফ্রান্স জানিয়েছে, অন্যান্য বিমান সংস্থার মতো তাদেরও যেসব দেশে সেবা পরিচালিত হয়, সেসব দেশের কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত প্রবেশসংক্রান্ত নিয়ম গ্রাহক ও কর্মীদের ক্ষেত্রে মেনে চলতে হয়।

মিডিয়াপার্টের পর্যালোচনা করা এয়ার ফ্রান্সের পাইলট ও কেবিন ক্রুদের উদ্দেশে পাঠানো একটি অভ্যন্তরীণ স্মারকপত্রে বলা হয়েছে, নির্দেশনা অমান্য করলে বিমান সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মীরা উভয়েই শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখে পড়তে পারেন।

যেসব দেশের নাগরিকদের ওপর বিধিনিষেধ
ইসরায়েলি সম্প্রচারমাধ্যম এন১২-এর তথ্য অনুযায়ী, গত ১ অক্টোবর দেশটির পরিবহন ও সড়ক নিরাপত্তা মন্ত্রণালয় বিদেশি বিমান সংস্থাগুলোকে নতুন নির্দেশনার কথা জানায়। এতে বলা হয়, ইসরায়েলি আকাশসীমায় ফ্লাইট পরিচালনাকারী পাইলট ও কেবিন ক্রুদের এমন কোনো দেশের নাগরিক হওয়া চলবে না, যাদের সঙ্গে ইসরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। দ্বৈত নাগরিকত্বের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য।

প্রতিবেদনগুলোতে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা দেশের সংখ্যা নিয়ে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। কোথাও ৩১টি দেশের কথা বলা হয়েছে, আবার ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের একটি অভ্যন্তরীণ শিডিউলিং স্মারকপত্রে ২৯টি দেশের তালিকা রয়েছে।

বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ইরান, ওমান, সৌদি আরব, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার পাশাপাশি আফগানিস্তান, ইরাক, লেবানন, কাতার, সিরিয়া ও ইয়েমেনের নাগরিকেরাও এই বিধিনিষেধের আওতায় রয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই নির্দেশনার কারণে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নাগরিকদের কর্মী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলোকে ইসরায়েলগামী ফ্লাইটের দায়িত্ব বণ্টন নতুন করে বিবেচনা করতে হতে পারে।

ফ্লাইদুবাইয়ের ফ্লাইটে ঘটনার পর নির্দেশনা
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৩০ সেপ্টেম্বর দুবাই থেকে তেল আবিবগামী ফ্লাইদুবাইয়ের একটি ফ্লাইটে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। এর এক দিন পরই নতুন বিধিনিষেধের নির্দেশনা জারি করে ইসরায়েল।

আল জাজিরা সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, ওই ফ্লাইটের একজন ওমানি কো-পাইলটের বিরুদ্ধে ভারতীয় ক্যাপ্টেনকে আক্রমণ এবং বিমান ছিনতাইয়ের চেষ্টা করার অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে বিমানটি বিধ্বস্ত করার চেষ্টার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

ঘটনায় ভারতীয় ক্যাপ্টেন আহত হন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পর তিনি সুস্থ হয়ে উঠছেন।

তবে ফ্লাইটে ঘটে যাওয়া এই ঘটনা এবং পরদিন ইসরায়েলের নতুন নির্দেশনা জারির মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা প্রকাশিত তথ্য ও প্রতিবেদন থেকে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।

আরও যেসব বিমান সংস্থা নিয়ম মানছে
এয়ার ফ্রান্সের পাশাপাশি চেক প্রজাতন্ত্রের বৃহত্তম বিমান সংস্থা স্মার্টউইংসও ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা পাওয়ার কথা নিশ্চিত করেছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, তারা প্রযোজ্য সব নিয়ম মেনে চলবে।

স্মার্টউইংসের মুখপাত্র ভ্লাদিমিরা দুফকোভা আল জাজিরাকে বলেন, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নির্দেশনাটি পেয়েছেন তাঁরা। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দেওয়া সব নিয়ম পর্যবেক্ষণ ও অনুসরণ করছেন।

তবে স্মার্টউইংসের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন নির্দেশনার কারণে তাদের ফ্লাইট পরিচালনা, ক্রু ব্যবস্থাপনা কিংবা ইসরায়েলগামী ও ইসরায়েল থেকে আসা ফ্লাইটে কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব পড়েনি।

ইউনাইটেড এয়ারলাইনসও তাদের পাইলট ও কেবিন ক্রুদের জাতীয়তাভিত্তিক এই বিধিনিষেধ সম্পর্কে অবহিত করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে মার্কিন বিমান সংস্থাটি এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে রাজি হয়নি। তারা ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সরাসরি নির্দেশনা পেয়েছে কি না কিংবা এ বিষয়ে কী পদক্ষেপ নিয়েছে, তা-ও নিশ্চিত করেনি।

নতুন এই বিধিনিষেধের ফলে ইসরায়েলে ফ্লাইট পরিচালনাকারী আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলোকে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের জাতীয়তা বিবেচনায় রেখে দায়িত্ব বণ্টন করতে হতে পারে। তবে বিভিন্ন বিমান সংস্থার বক্তব্য অনুযায়ী, নির্দেশনাটির বাস্তব প্রভাব একেক প্রতিষ্ঠানে একেক রকম হতে পারে।

সূত্র : আল জাজিরা ও মিডিয়াপার্ট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *