মিরপুরে আজও পোশাকশ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ

রাজধানীর মিরপুরে আজও সড়কে নেমে বিক্ষোভ করছেন তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। এ সময় পুলিশের সঙ্গে পোশাক শ্রমিকদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।

 

মঙ্গলবার (০৩ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে শ্রমিকরা মিরপুর-১১ নম্বর মেট্রোস্টেশনের নিচে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন।

 

এ সময় তারা বিভিন্ন দিক থেকে পুলিশকে লক্ষ্য করে  ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকেন। শ্রমিকরা সড়কে কাঠের আসবাব জড়ো করে আগুন ধরিয়ে দেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে। দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।

 

এ ঘটনায় মিরপুর-১১ নম্বর ও আশপাশের এলাকায় উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

 

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মিরপুর-১১ নম্বর মেট্রোস্টেশনের পশ্চিম পাশে পুলিশ সদস্যরা অবস্থান নিয়েছিলেন। অন্যদিকে মিরপুর-১০ নম্বর, নান্না মার্কেট এলাকার বিভিন্ন গলি ও মিরপুর-১২ নম্বরের দিক থেকে দলে দলে শ্রমিকেরা এসে বিক্ষোভে যোগ দেন। একপর্যায়ে তারা তিন দিক থেকে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে শুরু করেন।

 

এ সময় শ্রমিকেরা সড়কে বেঞ্চসহ কাঠ জড়ো করে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সদস্যরা সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করেন। পাশাপাশি শ্রমিকদের ধাওয়া দিয়ে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করেন তারা।

 

এদিকে ন্যূনতম মজুরি ও ভাতা বাস্তবায়নের দাবিতে টানা তৃতীয় দিনের মতো উত্তপ্ত সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল এলাকা। অধিকাংশ পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।

 

সকালে আশুলিয়ার বিভিন্ন কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়লে কোথাও কোথাও কর্মবিরতি ও বিক্ষোভের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি বিবেচনায় কয়েকটি কারখানা কর্তৃপক্ষ সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। শিল্পাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

 

এদিকে শ্রমিকরা টঙ্গী-আশুলিয়া- ইপিজেড আঞ্চলিক মহাসড়কে কয়েকটি স্থানের সড়ক অবরোধ করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আঞ্চলিক সড়ক থেকে শ্রমিকদের সরিয়ে দিতে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। এ সময় পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। নরসিংহপুর, জামগড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় খণ্ড খণ্ড সংঘর্ষের কথা জানা গেছে।

সোমবারে শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনায় সাভার ও আশুলিয়া থানায় পৃথক মামলা হয়েছে বলে জানা গেছে। শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার শ্রমিক অসন্তোষের কারণে ২৬৪টি কারখানায় এক দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়।

 

ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মুস্তাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, নাশকতার সঙ্গে জড়িতরা সাধারণ শ্রমিক নন। তাদের বিষয়ে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

 

অন্যদিকে, ন্যূনতম মজুরি কাঠামো বাস্তবায়নের দাবিতে চলমান শ্রমিক অসন্তোষের মধ্যে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে চারজনকে আটক করেছে আশুলিয়া থানা পুলিশ। এ ঘটনায় আশুলিয়া থানায় একটি মামলা হয়েছে। মামলায় অজ্ঞাতনামা কয়েকশ ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।

 

শ্রমিক অসন্তোষের কারণে শিল্পাঞ্চলের উৎপাদন ও স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।

 

রোববার (১ নভেম্বর) শ্রমিকদের আন্দোলনের মুখে সরকার রফতানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে।

 

এর আগে তৈরি পোশাকশিল্পে সর্বশেষ নিম্নতম মজুরি বোর্ড হয়েছিল ২০২৩ সালে। ওই বছরের ১ ডিসেম্বর মজুরি কাঠামো কার্যকর করার আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল। ২০২৩ সালের মজুরি বোর্ড ছয়টি সভা করে ওই বছরের নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ১২ হাজার ৫০০ টাকা নিম্নতম মজুরির সুপারিশ করেছিল। এরপর ডিসেম্বরে চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার।

 

পোশাকশ্রমিকদের সর্বশেষ ন্যূনতম মজুরি কার্যকর হয় ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে। তবে শ্রম আইন সংশোধন হওয়ার পর নাকি, আগে থেকে তিন বছরের সময় গণনা করা হবে তা নিয়ে শ্রমিক ও মালিকপক্ষের ভিন্নমত ছিল। যদিও শ্রমিক আন্দোলনের মুখে সেই ভিন্নমত টেকেনি।

 

তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের জন্য ১৯৯৪ সালে প্রথমবার নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করে সরকার। সেই বোর্ড ৯৩০ টাকা নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ করে। ২০০৬ সালে সেটি বৃদ্ধি করে ১ হাজার ৬৬২ টাকা ৫০ পয়সা করা হয়। ২০১০ সালের মজুরি বোর্ডে শ্রমিকের নিম্নতম মজুরি ৩ হাজার টাকা করা হয়। ২০১৩ সালের মজুরি বোর্ড ৫ হাজার ৩০০ টাকা নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ করে। সর্বশেষ ২০১৮ সালের মজুরি বোর্ড পোশাকশ্রমিকদের জন্য ৮ হাজার টাকা নিম্নতম মজুরি চূড়ান্ত করে। তার মধ্যে মূল মজুরি ৪ হাজার ১০০ টাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *